আইসিএএনের প্রতিবেদন

পারমাণবিক অস্ত্র খাতে মিনিটে ব্যয় ১ লাখ ৯০ হাজার ডলার

যেকোনো ভূরাজনৈতিক উত্তেজনায় এখন পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহারের আশঙ্কা দ্রুতই সামনে চলে আসে।

যেকোনো ভূরাজনৈতিক উত্তেজনায় এখন পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহারের আশঙ্কা দ্রুতই সামনে চলে আসে। সাম্প্রতিক ভারত-পাকিস্তান সংঘাত, এখন ইরানে ইসরায়েলের হামলা ঘিরে মধ্যপ্রাচ্য সংকটেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তেহরানের হামলার কাছাকাছির সময়ে প্রকাশিত ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন টু অ্যাবোলিশ নিউক্লিয়ার উইপন্সের (আইসিএএন) প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ২০২৩ সালের তুলনায় গত বছর বিশ্বের নয়টি পারমাণবিক শক্তিধারী দেশ অস্ত্র সমৃদ্ধকরণে ব্যয় ১১ শতাংশ বাড়িয়েছে। দেশগুলো প্রতি মিনিটে এ খাতে খরচ করেছে ১ লাখ ৯০ হাজার ১৫১ ডলার।

‘হিডেন কস্টস: নিউক্লিয়ার উইপন্স স্পেন্ডিং ইন ২০২৪’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের তুলনায় পারমাণবিক অস্ত্র খাতে ব্যয় বেড়েছে ১ হাজার কোটি ডলার। এতে মোট ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ২০ কোটি ডলার। মূলত অস্ত্রের আধুনিকায়ন ও কিছু ক্ষেত্রে অস্ত্রভাণ্ডার সম্প্রসারণে এ অর্থ ব্যয় হয়েছে।

পারমাণবিক অস্ত্র সম্পূর্ণ বিলুপ্তির পক্ষে কাজ করছে জেনেভাভিত্তিক আইসিএএন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে ২০২৪ সালে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে তা জাতিসংঘের বার্ষিক বাজেটের ২৮ গুণ।

পারমাণবিক অস্ত্র মজুদের কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করে আটটি দেশ— যুক্তরাজ্য, চীন, ফ্রান্স, ভারত, উত্তর কোরিয়া, পাকিস্তান, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র। এর বাইরে রয়েছে ইসরায়েল। আইসিএএনের প্রতিবেদন অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্র একাই অন্য আট পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশের সম্মিলিত ব্যয়ের চেয়ে বেশি ব্যয় করেছে। আগের বছরের তুলনায় রেকর্ড ৫৩০ কোটি ডলার বেড়ে ২০২৪ সালে দেশটির এ খাতে মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৬৮০ কোটি ডলার।

এরপর চীন ব্যয় করেছে ১ হাজার ২৫০ কোটি ডলার। আগের বছরের তুলনায় ২২০ কোটি ডলার বেড়ে যুক্তরাজ্যের মোট ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৪০ কোটি ডলার।

পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যয় বৃদ্ধিতে চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব রয়েছে। আইসিএএনের পলিসি অ্যান্ড রিসার্চ কো-অর্ডিনেটর অ্যালিসিয়া স্যান্ডার্স-জাকর বলেন, ‘যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যে ইউক্রেন যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার উল্লেখ দেখা গেছে, যা পারমাণবিক অস্ত্র খাতের ব্যয় বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে।’

তিনি এও জানান, বর্তমান নিরাপত্তা সংকটের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি অস্ত্র চুক্তির অর্থ পরিশোধ ও নতুন পারমাণবিক অস্ত্র পরিবহন ব্যবস্থা বিকাশই ব্যয় বৃদ্ধির মূল কারণ।

পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ চুক্তি ট্রিটি অন দ্য প্রহিবিশন অব নিউক্লিয়ার উইপন্স প্রণয়নে ভূমিকা রাখার জন্য ২০১৭ সালে আইসিএএন নোবেল শান্তি পুরস্কার পায়। ২০২১ সালে কার্যকর হওয়া এ চুক্তি এখন পর্যন্ত ৬৯টি দেশ অনুমোদন করেছে। চারটি দেশ সরাসরি এতে যুক্ত হয়েছে এবং আরো ২৫টি দেশ স্বাক্ষর করেছে। তবে কোনো পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশই চুক্তিতে যোগ দেয়নি।

প্রতিবেদন সম্পর্কে আইসিএএনের প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর সুসি স্নাইডার বলেন, ‘পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ একটি সমাধানযোগ্য সমস্যা। এটি করতে হলে আমাদের বুঝতে হবে কীভাবে কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী এ ধ্বংসাত্মক অস্ত্র রাখার পক্ষে প্রাণপণ লড়াই করছে।’

প্রতিবেদনে অন্য দেশের মাটিতে রাখা পারমাণবিক অস্ত্র মজুদসংক্রান্ত খরচও আলোকপাত করেছে আইসিএএন। সেখানে বলা হচ্ছে, এ ধরনের খরচ সম্পর্কে সাধারণ নাগরিক ও আইনপ্রণেতারা প্রায় কিছুই জানেন না, যা কিনা গণতান্ত্রিক নজরদারি এড়িয়ে যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বেলজিয়াম, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস ও তুরস্কের ভূখণ্ডে মার্কিন পারমাণবিক অস্ত্র মজুদ রয়েছে। কিন্তু সরকারিভাবে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়নি। আবার বেলারুশে নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে, রাশিয়া এমন দাবি করলেও অনেকে বিশেষজ্ঞ এতে সন্দেহ প্রকাশ করেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ন্যাটোভুক্ত ইউরোপীয় দেশগুলোয় মার্কিন পারমাণবিক অস্ত্র মজুদসংশ্লিষ্ট খরচ সম্পর্কে ‘সাধারণ মানুষের কাছে খুব কম তথ্য’ রয়েছে। এসব খরচের মধ্যে রয়েছে স্থাপনার নিরাপত্তা, পারমাণবিক অস্ত্রসমৃদ্ধ জেট ও অস্ত্র ব্যবহারের প্রস্তুতি খরচ।

প্রতিটি ন্যাটো দেশের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র মজুদ গোপন চুক্তির মাধ্যমে পরিচালিত হয় বলে জানাচ্ছে আইসিএএন। প্রতিবেদনের সহলেখক স্যান্ডার্স জাকর বলেন, ‘তাদের দেশে অন্য দেশের পারমাণবিক অস্ত্র রাখা হয়েছে কিনা বা এসবের জন্য কত অর্থ খরচ হচ্ছে নাগরিক ও আইনপ্রণেতারা তা জানেন না। এটা গণতন্ত্রের জন্য অপমানজনক।’

বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ৪৬ হাজার ৩০০ কোটি ডলারের পারমাণবিক অস্ত্র চুক্তি সক্রিয় রয়েছে। যার অনেকগুলো মেয়াদ শেষ হবে কয়েক দশক পর। ২০২৪ সালে নতুন করে অন্তত ২ হাজার কোটি ডলারের পারমাণবিক অস্ত্র চুক্তি হয়েছে। এছাড়া একই বছরে এ ধরনের চুক্তি থেকে অন্তত ৪ হাজার ২৫০ কোটি ডলার আয় করেছে বেসরকারি সংস্থাগুলো।

এ ধরনের চুক্তি পেতে বেসরকারি কোম্পানিগুলো লবিং বা দেনদরবারের পেছনে প্রচুর অর্থ খরচ করে বলে জানিয়েছে আইসিএএন। গত বছর শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সে এ বাবদ ১২ কোটি ৮০ লাখ ডলার ব্যয়ের তথ্য পাওয়া গেছে।

এদিকে এপ্রিলে প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআইপিআরআই) জানিয়েছে, ২০২৪ সালে শতাধিক দেশ আগের বছরের তুলনায় সামরিক ব্যয় বাড়িয়েছে। এমনকি অন্যান্য খাতে খরচ কমিয়ে যুদ্ধ সরঞ্জাম ক্রয়ে ব্যয় বাড়িয়েছে অনেক দেশ। সব মিলিয়ে ২০২৪ সালে বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় রেকর্ড পৌনে ৩ ট্রিলিয়ন বা ৩ লাখ কোটি ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে।

আরও